সর্বশেষ আপডেট



» হাইতকান্দির দমদমা অভয়শরণ বৌদ্ধ বিহারে দিনব্যাপী কঠিন চীবর দানোৎসব

» জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন আ’লীগের ব্যতিক্রমী প্রীতি ফুটবল ম্যাচ

» মিরসরাই কলেজে দেয়াল পত্রিকার মোড়ক উন্মোচন ও আনন্দ আড্ডা

» করেরহাটে পিকআপ-সিএনজি অটোরিক্সা সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৬

» ইছাখালীর জেগে উঠা খাস চর এখন স্বর্ণের চরে পরিণত হয়েছে-ইঞ্জি. মোশাররফ

» মিরসরাইয়ে জাতীয় যুব দিবস পালিত

» চট্টগ্রাম নগরীতে শতভাগ আলোকায়ন হচ্ছে, বসবে ২০ হাজার ৬’শ এলইডি বাতি

» করেরহাট জয়পুর পূর্ব জোয়ার আ.নেছা ও. হক উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০১৬ ব্যাচের পুণর্মিলনী

» মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীর ৩০০ একর জমিতে হচ্ছে ট্যানারি পল্লী

» উন্নয়নের স্বার্থে আগামীতেও আ’লীগকে ক্ষমতায় রাখতে হবে-ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ

» সৃজন যুব সংঘের আয়োজনে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মৎস্য চাষ প্রশিক্ষণ

» তরুণ সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী মঞ্জুর মোর্শেদ কনকের পিতা আলহাজ্ব মাহবুবুর রহমান অসুস্থ্য, দোয়া কামনা

» ২১ শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলা করে তারেক জিয়া শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চেয়েছিল-ইঞ্জি. মোশাররফ

» চট্টগ্রামে প্রায় ৫২৪ কোটি টাকার ৭ প্রকল্প উদ্বোধন করলেন সেতুমন্ত্রী

» মিঠানালায় শাহ সূফী নূর মুহাম্মদ নিজামপুরী (রঃ) বার্ষিক মাহফিল ২৮ অক্টোবর

» মায়ানীতে ‘‌এ.এইচ.আর.আই’ চট্টগ্রাম শাখার উদ্যোগে বৃক্ষরোপন ও পরিচিতি সভা

» বিগত নির্বাচনে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে-ইঞ্জি. মোশাররফ

» প্রতি উপজেলা থেকে ১০ জনকে ধরতে চায় দুদক

» মিরসরাইয়ের ১০টি স্কুল, মাদ্রাসাও কলেজ এমপিওভুক্ত

» আল্লাহ ও নবীর কটূক্তিকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির আইন করতে হবে-হেফাজত

সম্পাদক ও প্রকাশক

এম আনোয়ার হোসেন
মোবাইলঃ ০১৭৪১-৬০০০২০, ০১৮২০-০৭২৯২০।

সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ

প্রিন্সিপাল সাদেকুর রহমান ভবন (দ্বিতীয় তলা), কোর্ট রোড, মিরসরাই পৌরসভা, চট্টগ্রাম।
ই-মেইলঃ press.bd@gmail.com, newsmirsarai24@gmail.com

Desing & Developed BY GS Technology Ltd
১১ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং,২৮শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

এস ওয়াজেদ আলি ও বিশ শতকের উত্তরাধিকার

ওয়াজেদ আলীর পিতামহ শেখ জামাতউল্লাহ অষ্টাদশ শতকের সামাজিক প্রেক্ষিতে ছিলেন এক ব্যতিক্রমী পুরুষ। যে সময় বাঙালি মুসলমানকে ভাগ্যান্বেষণে ভিনদেশমুখী হতে প্রায় দেখাই যেতনা, সেই সময়ে জামাতউল্লাহ হুগলি থেকে প্রথমে মুর্শিদাবাদ, সেখান থেকে গোয়ালন্দ, আবার সেখান থেকে সুরমা নদীর তীরে শ্রীহট্টে গিয়ে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

হুগলির চন্ডীতলার  নবাবপুরে ছিল ওয়াজেদ আলীর মামার বাড়ি। তাঁর মাতামহ মুঙ্গের থেকে জায়গীর নিয়ে এসেছিলেন নবাবপুরে ।বিয়ে করেছিলেন স্থানীয় বাঙালি পরিবারে। ধর্মীয় বিধিবিধানের   পাশাপাশি  সমন্বয়ী চেতনাসমৃদ্ধ পারিবারিক পরিবেশে ওয়াজেদ আলীর শৈশব কেটেছিল।

ওয়াজেদ আলীর পিতার শৈশবকালে জনাই অঞ্চলের সামাজিক পরিবেশে এতটাই মুসলিম- বিদ্বেষ বলবান ছিল যে, তিনি শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কারণে বড় তাজপুরের পাশে জনাই হাইস্কুলে ভর্তি পর্যন্ত হতে পারেননি সেকালে।

ওয়াজেদ আলীর শিক্ষা শুরু হয়েছিল বড় তাজপুরের পাঠশালাতে। সেই সময়ের গ্রাম্য প্রথা অনুযায়ী মাত্র ৭ বছর বয়সে তার বিবাহ হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি শিলংয়ে চলে আসেন এবং পিতার তত্ত্বাবধানে শুরু হয় তার আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ। শিলংয়ের মোখার হাইস্কুলে তার ছাত্র জীবনের বুনিয়াদ তৈরি হয়েছিল। সেই স্কুলটি তখন ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত। সেখান থেকে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন ।

এই সময়কালে স্মৃতিচারণ করে ওয়াজেদ আলী পরবর্তীকালে লিখেছেন:

“আমার জন্ম বাংলাদেশে কিন্তু আসাম প্রদেশ কে আমার স্নেহময়ী ধাত্রী বললে কিছু অতিশয়োক্তি হবেনা। আমি বাল্যকালে আসাম দেশে এসেছিলুম। আর এ শিলং শহরেই আমার বাল্য  এবং কৈশোর জীবন অতিবাহিত হয়েছে।… ব্যক্তিগতভাবে আমি বলতে পারি, আমার জীবনের সমস্ত প্রেরণার, সমস্ত আদর্শের অঙ্কুর এ আসাম দেশেই হয়েছে।

বঙ্গ ভাষার প্রতি আমার অনুরাগ এ আসাম দেশে প্রথম উপ্ত হয়েছিল। আমি আমার মাতৃভূমি বাংলা এবং ধাত্রী ভূমি আসামকে এক অখণ্ড দেশ হিসেবেই আজীবন দেখে এসেছি (সাহিত্যের লক্ষ্য, সাওগাত, বৈশাখ, ১৩৫২, পৃ- ২৪৬-২৫১)।”

উচ্চশিক্ষার জন্য ওয়াজেদ আলী আলীগড় এমএও কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে কৃতী ছাত্র হিসেবে তার যথেষ্ঠ খ্যাতি ছিল। ১৯০৮ সালে তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইএ এবং ১৯১০  সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন। এটা খুব বিস্ময়ের ব্যাপার যে, আলীগড়ের অবাঙালি পরিবেশ, উর্দুভাষিদের আধিপত্য এবং তাদের সংস্কৃতির প্রতি পারিপার্শ্বিকতার আকর্ষণ- এই সবকিছুকে অতিক্রম করে, সেই সময় থেকেই বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি এস ওয়াজেদ আলী এক গভীর অনুরাগ নিজের উপলব্ধিতে এনেছিলেন। বাংলা ভাষাকে তিনি তখনও যথেষ্ঠ দক্ষ নন, এ মানসিক যন্ত্রণা এ সময়ে তাকে যথেষ্ঠ পীড়িত করতো।

বিএ পাশ করার পরে নিজের গ্রাম বড় তাজপুরে ফিরে এসে, বাংলার গ্রামীণ পরিবেশ, সমন্বয়ী সংস্কৃতির নানা ধারা, বিশেষ করে কীর্তন ঘিরে গ্রামীণ সামাজিক পটভূমিকার যে বহিরঙ্গ, তা এস ওয়াজেদ আলীকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার্থে লন্ডনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএ এবং বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি পান। লন্ডনপ্রবাসেই তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেছিলেন। এ সময়কালে তিনি গুরুতর ভাবে পীড়িত হন এবং প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। সেই সময় তাকে সাহায্য করেছিল ব্রিস্টলের মেয়ে মিস মিলি। তাকেই তিনি পরবর্তীতে বিবাহ করেছিলেন।

১৯১৫ সালে দেশে ফিরে আসার পর প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদও ঘটে যায় ওয়াজেদ আলির। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদের প্রসঙ্গে তার বাবার সঙ্গে তার কিছুটা মনান্তর হয়েছিল। ১৯১৫ সাল থেকে ১৯২২ সাল, এ আট বছর আইন ব্যবসায় এস ওয়াজেদ আলী অত্যন্ত সুনাম অর্জন করেন। এই সময়েই  সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তার গভীর সংযোগ তৈরি হয়।

এ সংযোগ তৈরির ফলে তার যে বন্ধুমহল তৈরি হয়, সেখানে উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল প্রমথ চৌধুরী, এস খোদাবক্স এবং সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের। ওয়াজেদ আলী নিজেই লিখছেন-

“বঙ্গভাষার বিখ্যাত সাহিত্যিক, সবুজপত্র সম্পাদক, বন্ধুবর শ্রীযুক্ত প্রমথ চৌধুরী মহাশয়ের  উপদেশেই আমি প্রথম বাংলায় লিখতে আরম্ভ করি। আমার সাহিত্যিক জীবনের প্রারম্ভে তার উপদেশ ও উৎসাহ না পেলে হয়তো বাংলা সাহিত্যের জনতাবহুল আসরে কখনও নামতুম না

(দিবাচা। ‘গুল দাস্তা ‘-র অন্তর্গত।১৩৩৪ বঙ্গাব্দে কলকাতা থেকে প্রথম প্রকাশিত।মোহাম্মদ শামসুদ্দিন এই গ্রন্থটির মুদ্রক ও প্রকাশক ছিলেন)।”

‘সওগাত’  পত্রিকার ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের বার্ষিক সংখ্যায় এস ওয়াজেদ আলী সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরী স্বয়ং  লিখেছিলেন:

“তাঁহার রচনা সবুজপত্র, বঙ্গবাণী , ভারতী, সওগাত, সাহিত্যিক প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়া থাকে। এতদ্ব্যতীত তিনি ইংরেজি রচনায় সিদ্ধহস্ত। ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকায় Pathshala  শিরোনামে তাহার একটি উৎকৃষ্ট ইংরেজি রচনা প্রকাশিত হইয়াছিল। গত বৎসর তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভাপতি পদে বারিত হইয়াছিলেন এবং বর্তমান বর্ষেও উক্ত পদে অধিষ্ঠিত আছেন। তাহার বাংলা রচনা প্রশংসার্হ।”

এ সময়ে (১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ) এস ওয়াজেদ আলী কলকাতা  প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিযুক্ত হন। এই নতুন চাকরির কালে সাহিত্যকর্মে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দিয়েছিলেন ওয়াজেদ আলী।

১৯১৯ সালে ‘সবুজপত্রে’ তার প্রথম বাংলা প্রবন্ধ ‘অতীতের বোঝা’ প্রকাশ হয়। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ‘ইসলাম দর্শনে’ তার প্রথম ছোটগল্প ‘রাজা’ প্রকাশ হয়। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। এই সংগঠনের সঙ্গে মুজাফফর আহমদের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

সেই বছরেই বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির পঞ্চম বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব তিনি পালন করেন এবং অভিভাষণও পাঠ করেন। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯২৬ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সাধারণ সভায় অংশ নিয়ে ‘তরুণের কাজ’ নামক এক অসামান্য প্রবন্ধ তিনি পাঠ করেন।

সেই বছর বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভাপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন তিনি। ১৯২৭ সালে অবশ্য বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভাপতির পদ থেকে নিজেকে ওয়াজেদ আলি সরিয়ে নেন। ১৯২৮ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির চতুর্থ অধিবেশন, যেটি অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার বসিরহাটে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে তিনি অংশ নেন এবং প্রবন্ধ পাঠ করেন ।

১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির পক্ষ থেকে, মূলত মুজাফফর আহমদের প্রচেষ্টায় কলকাতার আলবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউসে ) কাজী নজরুলের জাতীয় সংবর্ধনার জন্য যে কমিটি তৈরি হয়েছিল, সেই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব এস ওয়াজেদ আলী পালন করেন।  সংশ্লিষ্ট সম্বর্ধনা সভায় অভিনন্দনপত্রটিও তিনি পাঠ করেছিলেন ।

সেই মাসেই আসাম মুসলিম ছাত্র সমিতির সাহিত্যিক সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে তিনি যোগ দেন। ১৯৩০  সালে নোয়াখালী মুসলিম ইনস্টিটিউটের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে তিনি যোগ দেন এবং একটি লিখিত ভাষণ দেন।

১৯৩২ সাল এস ওয়াজেদ আলী এবং বাংলার সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ বছরের ডিসেম্বর মাসে ওয়াজেদ আলী প্রচেষ্টায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অগ্রদূত সচিত্র মাসিক পত্রিকা ‘গুলিস্তাঁ’  প্রকাশ হয়।

এ পত্রিকা প্রকাশ ছিল ওয়াজেদ আলীর জীবনের এক কর্মময় অধ্যায়। ‘গুলিস্তাঁ’  পত্রিকাকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি সমন্বয়ী চেতনায় বিশ্বাসী, সম্প্রীতির চেতনায় বিশ্বাসী, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে অধিষ্ঠিত সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। পত্রিকাটির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রাক্তন মন্ত্রী খান বাহাদুর হাশেম আলী খান। মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপাত্র ‘শিখা’র মতোই এ ‘গুলিস্তা’ র মুখপত্রের প্রচ্ছদে লেখা থাকতো ‘হিন্দু মুসলমানের মিলনের অগ্রদূত’ শব্দবন্ধ।

এ পত্রিকার লেখকের তালিকায় ছিলেন কাজী নজরুল,  বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদা, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী আবদুল ওদুদ, মুজাফফর আহমদ, কেদারনাথ চট্টপাধ্যায় ( প্রবাসী পত্রিকার ), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী,  অন্নদাশঙ্কর রায়,  বুদ্ধদেব বসু , সজনীকান্ত দাস, কবিশেখর কালিদাস রায়, বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, কবি কাদের নেওয়াজ, কবি নির্মল দাস, অনুরূপা দেবী, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, ইন্দিরা দেবী, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, এ কে জয়নুল আবেদিন (নবযুগ পত্রিকার),  হুমায়ুন কবির , খান মইনুদ্দিন জুলফিকার হায়দার, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম যুগের অন্যতম সৈনিক আবদুল আজিজ, ভারতবর্ষ পত্রিকার সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য, রাধামোহন চৌধুরী (প্রবর্তক পত্রিকার সম্পাদক),  বিশ্বনাথ রায় (জনসেবা পত্রিকার সম্পাদক ), সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, আব্বাসউদ্দিন আহমেদসহ আরও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।

এ পত্রিকার ‘নারী জগৎ’  বিভাগ পরিচালনা করতেন অনুরূপা দেবী। অনেকেরই হয়তো জানা নেই, চলচ্চিত্রাভিনেতা ছবি বিশ্বাস এস ওয়াজেদ আলীর ‘গুলিস্তাঁ’ পত্রিকায় চলচ্চিত্র সংক্রান্ত বিভাগ ‘ছায়ার  মায়া’ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তাকে সহযোগিতা করতেন আব্বাসউদ্দিন আহমেদ এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ।

ঘোষিতভাবে এ পত্রিকার দর্শন হিসেবে বলা হত- ‘বাংলার জয় হোক এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যে ভিতর দিয়া স্বাধীনতাই আমাদের কাম্য।’

১৯৪৪ সালের ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ পত্রিকার চতুর্থ বার্ষিক উৎসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

সেই সভায় এস ওয়াজেদ আলী বলেছিলেন- “হিন্দু-মুসলমান এই উভয়কে লইয়াই বাঙালি জাতি,  বাঙালিকে শক্তিশালী জাতি হিসেবে গড়িতে হইলে বাংলা কৃষ্টির উন্নতি, অর্থনৈতিক উন্নতি, শিল্পের উন্নতি করতে হইলে হিন্দু-মুসলমানের মিলন চাই। তাহা না হইলে সমগ্রভাবে জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। হিন্দু-মুসলমান সাহিত্যের মধ্য দিয়ে দিতে পারে,  গুলিস্তাঁ এরই জন্যে প্রতিষ্ঠিত ( গুলিস্তাঁ, অগ্রহায়ণ, ১৩৫১)”।

সেই অধিবেশনেই কবি কাদের নওয়াজ বলেছিলেন:

“গুলিস্তাঁ খাঁটি  বাঙালির বাংলা মাসিক পত্রিকা; গুলিস্তাঁ তথাকথিত বাংলা উর্দু ভাষাযর  প্রচলনের বিরুদ্ধে বলিয়াই আমরা গুলিস্তাঁর গুণগ্রাহী।”

১৯৪৪  সালের ডিসেম্বরে এ পত্রিকা আয়োজিত সাহিত্য সভায় এ কে ফজলুল হক অংশ নিয়েছিলেন। সেই অধিবেশনে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র  ‘যেতে নাহি দিব’ এবং প্রবোধ কুমার সান্যাল ‘শ্মশান’  নামক কবিতা আবৃত্তি করে এক অসাধারণ সম্প্রীতির পরিবেশ রচনা করেছিলেন ।

তাছাড়াও আব্বাসউদ্দিন আহমেদ, কালিদাস চক্রবর্তী, কালিদাস রায়,  দীপালি গুপ্ত, বেদার উদ্দিন প্রমুখ গান গেয়েছিলেন। স্নেহলতা চক্রবর্তী বাঁশি বাজিয়েছিলেন। ফজলুল হক ছাড়াও খান বাহাদুর হাসেম আলী খান,  মৌলানা তফেল আহমদ চৌধুরি, অধ্যাপক বিনয় সরকার , প্রমথনাথ বিশী, হরিচরণ ঘোষ, প্রবাসী পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়, ভগ্নদূত পত্রিকার সম্পাদক শিশির কুমার বসু , প্রবর্তক পত্রিকার রাধারমন চৌধুরী, প্রত্যহ ও পরাগ পত্রিকার ডাক্তার অজিত শঙ্কর দে,  স্বপনবুড়ো- অখিল নিয়োগী , নবযুগ পত্রিকার পক্ষে নুরুল ইসলাম খান মৌলভী মিজানুর রহমান, কবি কাদের নেওয়াজ, কবি হাতেম আলী নওরোজি, এস সিদ্দিকী, অনিল দেব প্রমুখ সে অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।

ওয়াজেদ আলীর ‘মাশুকের দরবার’  গ্রন্থটি প্রকাশ হয় ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে ( ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বরে)। এ গ্রন্থেই তার বিখ্যাত ‘ভারতবর্ষ’ গল্পটি রয়েছে।  গ্রন্থটির প্রকাশকালে  গ্রন্থটির  সঙ্গে সংযুক্ত ছিল ওয়াজেদ আলীর বন্ধু সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় লেখা একটি পরিচয় পর্ব। সেখানে এই গল্পটি সম্বন্ধে সৌরীন্দ্রমোহন লিখছেন:

“ভারতবর্ষ গল্পটি অভিনব সৃষ্টি! অল্প পরিসরে এক মুদির ছোট্ট কথাটুকু-  তাও তার কাজ কারবার লাভ-লোকসান বা সুখ দুঃখ লইয়া নয়। ছোট দোকানে বসে মুদি রামায়ণ পড়ে, নাতি-নাতনিরা শোনে; মুদির ছেলে অদূরে বসিয়া সওদা বেঁচে – দোকান ঘর খানি খোলার,  ঘরে তেলের প্রদীপ জলে। পঁচিশ বৎসর পরে পাড়ার চারদিকে কত পরিবর্তন ঘটে গেল-  মাঠ কোঠা ভাঙ্গিয়া  প্রাসাদ উঠিল, জলা বস্তির বুকে পার্ক দেখা দিল,  মুদির দোকান কিন্তু তেমনি। বুড়া মুদির মৃত্যু হইয়াছে-  তার জায়গায় তার ছেলে আজ সেই রামায়ণ খুলিয়া বসিয়াছে এবং তার নাতি নাতনীকে পড়িয়া শুনাইতেছে শুধু এইটুকু কথা।”

“এমনি স্বচ্ছ অনাড়ম্বর বর্ণনাভঙ্গী, এমনি ভাবুকতা এই বইয়ের পৃষ্ঠা পূর্ণ ! বাংলা ভাষায় বিলাতি সেক্স সমস্যার ধুমধারাক্কা মধ্যে এই বইখানির সরল সহজ ভাষা, তার বিচিত্র ভাব, আর সাজেস্টিভনেস আমাকে একান্ত মুগ্ধ করিয়াছে এবং আমার বিশ্বাস সেক্স তত্ত্ব লইয়া যাঁরা মাথা ঘামাইতে বসেন নাই তারাও এই বইখানির পড়িয়া আনন্দ পাইবেন। ভাবিবার অনেক কথায় এ  বইয়ে  আছে। কিন্তু এত কথা বলিবার প্রয়োজন নাই ! জোৎস্না কিরণ দেখাইতে প্রদীপ ধরা বাতুলতা।”

এ গল্পের ভেতর দিয়ে এস ওয়াজেদ আলী যেন প্রাচ্যের জীবন-জীবিকার এক সতত প্রতীয়মান অক্ষয় চৈতন্যকে আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। মানব জীবন ধারা সতত পরিবর্তনশীল তাই এক ধর্ম সেই সতত পরিবর্তনশীল। তাকে অবলম্বনের ভেতর দিয়েই এক চিরন্তনতা বিরাজ করে।

সেই চিরন্তনতাকে গ্রহণ করে প্রতিটি জাতি বেঁচে থাকে। ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু কিংবা মুসলমান,  প্রত্যেকেরই মানসভূমিতে বিশ্বাসের একটি মাধুর্য আছে। সেই মাধুর্য এবং লাবণ্য, তাঁদের রোজনামচাকে সামনের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে ।

সময়ের পরিবর্তন হয় ঘড়ির কাঁটা ধরে। সেই কাটার তালে তাল রেখে মানুষের প্রকাশভঙ্গির পরিবর্তন হয়। কিন্তু চিত্তের অবলম্বনে যে শাশ্বত বিশ্বাস ,তার যে কখনো পরিবর্তন হয় না- এই চিরন্তন ধ্রুবসত্যটি এস ওয়াজেদ আলী যেভাবে দেখিয়ে গেছেন, তা আজও কেবল ভারতবর্ষের মানুষদের জন্যেই নয়, গোটা বিশ্বের মানব সমাজের পক্ষেই সমান সত্য।

সভ্যতার অগ্রগতির বিরুদ্ধে একটি শব্দও ওয়াজেদ আলী কখনো উচ্চারণ করেননি। অথচ বিশ্বাসের গহীনে লালিত একটি সাধারণ মানুষের জীবন যাপনকে চরম সত্যের ভেতর দিয়ে তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তুলে ধরার এই অনুপম ভঙ্গিমা আজও ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক- নানা সমস্যার নিরিখে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে।

সবধরনের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধেই ওয়াজেদ আলী নিজের জীবন এবং কলমকে পরিচালিত করেছিলেন। ধর্মের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে যেমন তিনি সোচ্চার ছিলেন, তেমনি তিনি সোচ্চার ছিলেন দেশপ্রেমের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধেও। অত্যন্ত সোচ্চার ভাষাতেই  তিনি বলেছিলেন:

“গোঁড়া  ধার্মিক প্রকৃতপক্ষে ধার্মিক নয়, সে হলো ধর্মের একটা বিকৃত প্রতিচ্ছবি। ইংরেজিতে যাকে বলে ক্যারিকেচার। সে রকম ভারতবাসী কিংবা গোঁড়া বাঙালি ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক নয়। সে হলো দেশপ্রেমিকের বিকৃত প্রতিকৃতি।“

এখানেই  কিন্তু লুকিয়ে রয়েছে এস ওয়াজেদ আলীর জীবন দর্শন। বিংশ শতকের প্রথমভাগে, অবিভক্ত ভারতের নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যার ভিতরে দাঁড়িয়ে এস ওয়াজেদ আলী অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলেছিলেন:

“আমি মুসলমান সমাজের বটে, কিন্তু তারও উপর আমি মানুষ; আমি ভারতবাসী বটে কিন্তু তার উপর আমি মানুষ আমি বাঙালি বটে, কিন্তু তারও উপর আমি মানুষ; আমি ভারতবাসী বটে, কিন্তু তারও উপর আমি মানুষ; আমি বাঙালি বটে, কিন্তু তারও উপর আমি মানুষ (‘সাহিত্য জীবনের শিল্প’ শীর্ষক প্রবন্ধ)।”

তিনি লিখছেন:

“এ কথা ভুলবেন না যে আপনি মানুষ, আর সেই হিসেবে মানুষের বিশ্বব্যাপী সভ্যতার উত্তরাধিকারী। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ তার জীবনের প্রয়োজনের তাগিদে বিরাট ,বহুমুখী ব্যাপক এক সভ্যতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সেই বিচিত্র সৃষ্টি কাব্যে সব জাতির ই  দান আছে , সব ধর্মেরই দান আছে , আর সব কৃষ্টিরই দান আছে। তাদের সম্মিলিত প্রেরণা মানবজাতিকে উন্নত জীবনের নিত্যনূতন সন্ধান দিয়েছে। সেই প্রেরণা নির্দেশ যদি আমরা মেনে চলি তাহলে হিন্দু-মুসলমানের প্রগতিশীল জীবনের সন্ধান আমরা পাব, আর আশার উজ্জ্বল আলোক  তাহলে আমাদের জীবনযাত্রাকে সুগম আনন্দময় করে তুলবে।”

“তখন স্পষ্টই আমরা বুঝতে পারব যে নিজ নিজ ধর্ম হিসেবে আমরা হিন্দু কিংবা মুসলমান কিংবা খ্রিষ্টান কিংবা নাস্তিক হতে পারে বটে, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা বিশ্ববাসী, নাগরিক হিসেবে আমরা ভারতবাসী, আর জাতি হিসেবে বাঙালি (‘বাঙালি না মুসলমান’ এই প্রবন্ধটি ভারতবর্ষ পত্রিকায় আষাঢ়  সংখ্যা ১৩৫১ বঙ্গাব্দে  মুদ্রিত)

১৯৫১ সালের ১০ জুন কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলের ঝাউতলার নিজের বাড়িতে এস ওয়াজেদ আলী জীবনাবসান হয়। এই ক্ষণজন্মা, মুক্তচিন্তা অগ্রপথিকের’ ভারতবর্ষ’ গল্পটি ছাড়া আর কোনো লেখাই এখন আর সহজলভ্য নয়। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বাংলাদেশের বাংলা একাডেমির প্রধানের  দায়িত্বে থাকাকালীন এস ওয়াজেদ আলীর যাবতীয় রচনাকে একত্রে সংকলিত করেছিলেন।

বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত সেই রচনাসমগ্রও এখন সহজলভ্য নয়। ভারতীয় উপমহাদেশে বৈচিত্রময় সমন্বয়ী সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এস ওয়াজেদ আলী লেখা, জীবনের শিল্প, প্রাচ্য প্রতীচ্য, ভবিষ্যতের বাঙালি, আকবরের রাষ্ট্র সাধনা,  মুসলিম সংস্কৃতির আদর্শ, ইকবালের পায়গাম,  ভ্রমণকাহিনী – মোটর যোগে রাঁচির সফর, পশ্চিম ভারতে, ঐতিহাসিক উপন্যাস- গ্রানাডার শেষ বীর, গল্পগ্রন্থ-  মাশুকের দরবার, দরবেশের দোয়া ,ভাঙ্গাবাঁশী,  গুলদাস্তা ইত্যাদি আন্তরিকতার সঙ্গে পুনঃ  পুনঃ পাঠ একান্ত জরুরি।@bdnews

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক

এম আনোয়ার হোসেন
মোবাইলঃ ০১৭৪১-৬০০০২০, ০১৮২০-০৭২৯২০।

সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ

প্রিন্সিপাল সাদেকুর রহমান ভবন (দ্বিতীয় তলা), কোর্ট রোড, মিরসরাই পৌরসভা, চট্টগ্রাম।
ই-মেইলঃ press.bd@gmail.com, newsmirsarai24@gmail.com

Design & Developed BY GS Technology Ltd